চান্দিনা উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদাম তিন মাসে এক ছটাক ধানও সংগ্রহ হয়নি

প্রকাশিত: ১০:২০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০২৫

আকিবুল ইসলাম হারেছ:
চলতি আমন মৌসুমের তিন মাস সময় অতিবাহিত হলেও কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ৬ খাদ্যগুদামে এক ছটাক ধানও সংগ্রহ করতে পারেনি উপজেলা খাদ্য বিভাগ। ধান সংগ্রহের তিন মাস অতিবাহিত হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা, আংশিক পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, বন্যার কারণে একদিকে কৃষকদের আমনের কাঙ্ক্ষিত ফলন ঘরে তুলতে না পারা, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকদের সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে অনীহা, যার কারণে এখনো চান্দিনায় ধান সংগ্রহ শূন্যের কোঠায়।

সূত্র মতে, এই মৌসুমে চান্দিনা উপজেলায় সরকারিভাবে ২৬৭ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। গত বছরের ১৭ নভেম্বর থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়ে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। এখন পর্যন্ত এক কেজি ধানও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

একই সময়ের মধ্যে ৫৫২ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। সেই অনুসারে চান্দিনার ২টি মিলের মধ্যে ১টি মিলের সঙ্গে ৩৭০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করে উপজেলা খাদ্য বিভাগ। বুধবার পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল জমা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন। তবে ধান সংগ্রহ না হলেও চালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশাবাদী খাদ্য বিভাগ।

এদিকে রাইস মিল মালিকরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে চান্দিনাসহ সারা দেশে ভয়াবহ বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে কৃষকরা ধান উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন, যার কারণে বাজারে ধানসংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি মূল্যে ধান সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাঁদের। সংগৃহীত ধান থেকে গাড়িভাড়া, শ্রমিক খরচ, বিদ্যুৎ বিলসহ প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হচ্ছে সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে পাঁচ টাকা বেশি। এর পরও বাধ্য হয়ে লোকসান দিয়ে সরকারি গুদামে চাল দিতে হচ্ছে আমাদের।

চান্দিনার মেসার্স মদিনা অটো রাইস মিল মালিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক বলেন, ‘ধানসংকটে এরই মধ্যে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের জন্য সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, এটি উৎপাদন খরচের সঙ্গে মেলে না। আমাদের এক কেজি চাল উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৫২ টাকা। কিন্তু সরকার দাম নির্ধারণ করেছে ৪৭ টাকা। এই দামে গুদামে চাল দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তার পরও জামানত ফেরতের আশায় চাল দিতে হচ্ছে মিল মালিকদের।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্র জানায়, এ বছর উপজেলায় আমন ধান আবাদ করা জমির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪৩৩ হেক্টর। বন্যা ও আবাদ না করার কারণে ২ হাজার ৬৪৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলায় ৩৭ হাজার ৬৫০ জন কৃষক রয়েছেন। বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে ধানবীজ, ধানের চারা এবং সার প্রদান করা হয়। এবার চান্দিনায় আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৯ হাজার ৮০ হেক্টর, কিন্তু অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৪৩৩ হেক্টর।

কৃষকদের সাথে কথা হলে তারা জানান, ‘সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে নানা ধরনের ঝামেলা পোহাতে হয়। তাই আমরা স্থানীয় বাজার ও বাড়ি থেকে ধান বিক্রি করে দিই।’

সরকার নির্ধারিত ধান সংগ্রহের কোনো সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে চান্দিনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিঃ দায়িত্ব) এবিএস মুছা মাহমুদ বলেন, সরকার এ মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করেছে ৩৩ টাকা। খোলাবাজারে প্রতি কেজি ধান বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত মূল্যের দু-তিন টাকা বেশি দরে। ফলে কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি না করে স্থানীয় হাটবাজারে তাঁদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করছেন।